বর্তমান পৃথিবীতে প্রচলিত আছে প্রায় সাত হাজার ভাষা। আপনার কপাল কি কুঁচকে যাচ্ছে? বিস্ময়ে চোখের পাতা বড় করে ফেলছেন? বিস্ময়কর হলেও এটি সত্য। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করে আসলে রং-বেরঙের বিচিত্র সব ভাষার সমাহার দেখতে পাবেন। কোনটা শুনে মনে হবে কতো যে সুললিত! কোনটা শুনে আবার হয়তো হেসে লুটোপুটি খাবেন আর বলবেন, এটা আবার কেমন ভাষা রে বাবা!

আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে পৃথিবীতে কতোগুলো ভাষা ছিলো? এটি একটি জটিল প্রশ্ন। কারণ অতো আগে এখনকার মতো জরিপ-সিস্টেম চালু ছিলো না। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ছিলো না। পৃথিবীর এক প্রান্তের খবর অপর প্রান্তে পৌঁছতেই অনেক সময় বছর পেরিয়ে যেতো। এখনকার মতো নিমিষেই যে কোন খবর ছড়িয়ে পড়া বা যে কোন তথ্য দূর-দূরান্ত থেকে অন্যত্র পাঠানোর সুযোগ ছিলো না। তাই সেই সময়ে পুরো পৃথিবীতে প্রচলিত ভাষার সংখ্যা জানা মুশকিল। কিন্তু বর্তমান সংখ্যাকে অনুমান করে আমরা একটা ধারণা লাভ করতে পারি। নিশ্চয়ই সেই সময়েও পৃথিবীতে বিদ্যমান ভাষার সংখ্যা যে হাজারের ঘর পেরুবে, তাতে কোন সন্দেহ নাই।

এবার আসবো মূল প্রশ্নে। পৃথিবীতে এতো ভাষা বিদ্যমান থাকতে আরবীতে কেন কুরআন অবতীর্ণ হলো? প্রশ্নটা নানান কারণেই গুরুত্ববহ। আমরা যদি ইতিহাসের পাতা উল্টাই তবে দেখবো কুরআন নাযিলের প্রাক-কালে পৃথিবীতে বিজয়ীরূপে ছিলো দু’টি সভ্যতা। রোমান ও পারস্য। তাদের ভাষা-সাহিত্য-ধর্ম-কৃষ্টি পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে রাজত্ব করছিলো। সর্বত্রই এই দুই সভ্যতার জয়জয়কার। তাদের দ্বারা প্রভাবিত ছিলো দুনিয়ার বেশ বড়সড় একটি অংশ। এখনকার যুগে যেমন আমরা দেখছি আমেরিকান-ইউরোপিয়ান সভ্যতার মাতামাতি, ঠিক তেমন। সুতরাং অভিজাত ভাষা হিসেবে তাদের ভাষা বরিত হবে বিশ্বব্যাপী, এটাই তো স্বাভাবিক। এরচেও আরও বেশি স্বাভাবিক হওয়ার কথা ছিলো পৃথিবীতে বিজয়ী হিসেবে বিদ্যমান জাতির ভাষাতে কুরআন নাযিল হওয়া। এতে কুরআনের দ্বারা অন্যদের প্রভাবিত হওয়াটা বেশি সহজ ও সহায়ক ছিলো। কারণ আগে থেকেই তো এর প্রভাব ছিলো, এবার কুরআন তাকে সঙ্গ দেওয়ায় তা ফুলেফেঁপে আরো বেশি প্রভাবক হতো।

এ-তো কেবল তাত্বিক আলাপ। বাস্তবতার দর্পণে দৃষ্টি দিলে আমরা দেখি, কুরআন সেসময়ের বিজয়ী কোন জাতির ভাষাতে নাযিল হয়নি। কুরআন নাযিল হয়েছে এমন এক জাতির ভাষায়, যারা সভ্য পৃথিবীর দৃষ্টিতে ছিলো অসভ্যতার শীর্ষচূড়ায় অবস্থানরত। সভ্যতাহীন সেই জাতি এতোটাই অসভ্যতার নিকষকালো অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিলো যে, সভ্যরা তাদেরকে পদানত করারও প্রয়োজন মনে করেনি। সেই জন্যই মক্কা-মদীনা ও এর আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিলো পুরোই স্বাধীন ভূমি। সেখানে বসবাসরত গোত্রগুলোতে সংঘবদ্ধ গোত্রপতিরাই ছিলো হর্তাকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ। শুষ্ক মরু আর রুক্ষ আবহাওয়া সেই অঞ্চলকে দখল করে রেখেছিলো।

যুগে যুগে পণ্ডিতগণ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। তারা নিজেদের মতো করে এই প্রশ্নের উত্তর দাড় করিয়েছেন। কেউ কেউ আবার এমন প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন এই বলে যে, আল্লাহর মর্জি হয়েছে বলে তিনি আরবী ভাষাতে কুরআন নাযিল করেছেন। এতে আমাদের বলবার কিছু নাই। কারণ আল্লাহকে তাঁর কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায় না। বরং তিনিই সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ করে থাকেন। তাদের এই কথা ঠিকই আছে। আসলে আমরা তো জিজ্ঞাসাটা আল্লাহকে করছি না। যদি এমন হতো তাহলে সেই যুক্তিটা ধোপে টিকতো। এখন আর তা ধোপে টিকছে না। এই কারণে অন্য অনেকে আবার এই সম্পর্কে খোঁজ-খবর নেওয়া থেকে বিরত না হয়ে বরং এর উত্তর খোঁজায় নিরত হয়েছেন।

সবচে বড় জটিলতার সম্মুখীন হতে হয় যখন কেউ প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, কুরআন যদি সমগ্র মানবজাতির জন্যই অবতীর্ণ হয়ে থাকে তাহলে আরবীভাষায় কেন হলো? যারা আরবীভাষী না, তারা এই বুরআন কেমনে বুঝবে? কুরআন যখন নাযিল হয় তখন তা পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা ছিলো না, এখনও নেই। সুতরাং যদি সমগ্র মানবজাতির হিদায়াতই এর উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে তো আরবীতে কুরআনের অবতীর্ণ হওয়া এই উদ্দেশ্যের পরিপন্থী হচ্ছে।

এই ধরনের প্রশ্ন আসলে স্থুল চিন্তা থেকে সৃষ্ট। কারণ এভাবে প্রশ্ন করলে পৃথিবীর যে কোন ভাষাতেই কুরআন অবতীর্ণ হোক না কেন, প্রশ্নটা রয়েই যেতো। বাংলা-ইংরেজি-হিন্দি-উর্দু-ফার্সি-ল্যাটিন-স্প্যানিস-জার্মান বা এমন আরও অন্য কোন একটি ভাষায় কুরআন নাযিল হলে সেখানেও প্রশ্ন আসতো, পৃথিবীর সব মানুষ কি সেই ভাষা বুঝে? অবধারিতভাবে এর উত্তর হবে না। কারণ পৃথিবীতে এমন কোন ভাষা নেই, যেটি সকল মানুষ বুঝে। তাহলে বুঝা গেলো এই প্রশ্নটা আসলে প্রশ্ন হওয়ারই যোগ্যতা রাখে না।

আর যদি আমরা কল্পনা করে নেই যে, কুরআন আরবী ছাড়া ভিন্ন কোন ভাষায় নাযিল হয়েছে, সেক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশ্ন উত্থাপিত হতো সেই খবর কুরআন আমাদের বহু আগেই প্রদান করেছে। সূরা ফুসসিলাতে ইরশাদ হয়েছে,

وَلَوْ جَعَلْنٰهُ قُرْءَانًا أَعْجَمِيًّا لَّقَالُوا لَوْلَا فُصِّلَتْ ءَايٰتُهُۥٓ ۖ ءَا۬عْجَمِىٌّ وَعَرَبِىٌّ ۗ قُلْ هُوَ لِلَّذِينَ ءَامَنُوا هُدًى وَشِفَآءٌ ۖ وَالَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ فِىٓ ءَاذَانِهِمْ وَقْرٌ وَهُوَ عَلَيْهِمْ عَمًى ۚ أُولٰٓئِكَ يُنَادَوْنَ مِن مَّكَانٍۭ بَعِيدٍ

“আর আমি যদি এটাকে অনারবী ভাষার কুরআন বানাতাম তবে তারা নিশ্চিতভাবেই বলত, ‘এর আয়াতসমূহ বিশদভাষায় বর্ণিত হয়নি কেন’? এটি অনারবী ভাষায় আর রাসূল আরবীভাষী! বল, ‘এটি মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও প্রতিষেধক। আর যারা ঈমান আনে না তাদের কানে রয়েছে বধিরতা আর কুরআন তাদের জন্য হবে অন্ধত্ব। তাদেরকেই ডাকা হবে দূরবর্তী স্থান থেকে।”

আয়াত থেকে বুঝে আসে, তখন প্রশ্নকারীদের প্রশ্ন হতো ভিন্ন কিসিমের। তারা তখন বলতো, আরে ভাই এটা কেমন কথা! রসূল হলো আরবীভাষী অথচ তিনি যেই গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তাওহীদের দাওয়াত দিচ্ছেন সেটা ভিন্নভাষী! এটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্যতা হিসেবে চিহ্নিত হতো। সুতরাং রাসূল যে ভাষার হবেন, তার কাছে প্রেরিত গ্রন্থও সে ভাষারই হবে, এটিই যৌক্তিক ও উপযুক্ত। তাছাড়া কুরআন স্পষ্টকরে এই আয়াতে বলে দিচ্ছে, আরবীভাষায় নাযিলকৃত ওই কুরআন মুমিনদের জন্য হিদায়াত। সরল-সঠিক পথের দিশা। আর যারা ঈমানের আলোয় আলোকিত না তারা এর থেকে উপকৃত হতে পারবে না। তারা বাহ্যিকভাবে সুস্থ-সবল হলেও মূলত তাদের চোখের উপর একটি পর্দা পড়ে থাকে। যা তাদের সঠিক পথ দেখার মাঝে অন্তরায় হয়। তো কুরআন হিদায়াতগ্রন্থ হবার জন্য এর প্রতি ঈমান থাকা জরুরি। প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব ভাষায় তা অবতীর্ণ হওয়া তেমন গুরুত্ব রাখে না। যেহেতু অনুবাদের সহায়তা নিয়েও প্রাথমিকস্তরের ও হিদায়াতের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ কুরআনের বাণী অনুধাবন করা সম্ভব।

এবার কিন্তু প্রশ্নের মোড় ভিন্ন পথে ঘুরে যাবে। নতুন আঙ্গিকে প্রশ্ন আসবে সামনে। বলা হবে, আচ্ছা মেনে নিলাম যে, রাসূল যেই ভাষার হবেন, তার কাছে প্রেরিত গ্রন্থও সেই ভাষারই হবে, এটিই যৌক্তিক ও উপযুক্ত। তো পৃথিবীর অন্য কোন ভাষাভাষীর মধ্যেও তো শেষ নবীকে প্রেরণ করা যেতো। তাহলেই তো কুরআনের ভাষাও ভিন্ন হতো। এক্ষেত্রে আরবীকেই বেছে নেওয়ার পেছনে রহস্য কী?

এর জবাবও বিজ্ঞগণ বিভিন্নভাবে দিয়েছেন। প্রথমত আরবীতে কুরআন নাযিল হওয়ার শতভাগ যথার্থ কারণ তো নিশ্চিতরূপে একমাত্র আল্লাহই বলতে পারবেন। তিনি ছাড়া আর কারো পক্ষে এটি সুনিশ্চিতরূপে বলা সম্ভব নয়। তবুও আমরা এখানে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ তুলে ধরছি।

আরবীভাষা শব্দসম্ভারে অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি ভাষা। বয়সের দিক দিয়ে অতি প্রবীণ হওয়ায় এর শব্দভাণ্ডারে রক্ষিত আছে সাধারণভাবে অন্য যে কোন ভাষার চেয়ে অনেক বেশি শব্দ। শুধুমাত্র এক ঘোড়ার জন্যই রচিত হয়েছে একশতেরও অধিক শব্দ-বহর। কয়েকটি শব্দ তুলে ধরলেই বিষয়টির ব্যাপকতা বুঝতে পারবেন।

আরবীভাষায় সবেমাত্র জন্ম নেওয়া ঘোড়ার বাচ্চাকে বলে ‘মুহর’। দুধখাওয়া বন্ধ করেছে এমন বাচ্চাকে বলে ‘ফুলউ’। এক বছর বয়স হলে বলে ‘হাওলী’। দুই বছর হলে বলে ‘জাযআ’। তিন বছর বয়স হলে ‘সিনয়া’। চারবছর বয়স হলে বলে ‘রবাআ’। পাঁচ বছর বয়স হলে বলে ‘ক্বদিহা’। এভাবে ঘোড়ার বয়সের পরিক্রমায় তার নামের ধরন পাল্টাতে থাকে।

যেসব ঘোড়া দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় সেগুলোরও বিভিন্ন রকমের নাম আছে। যেমন –
সাবিক বা মুবাররিয : সর্বাগ্রে পৌঁছে যাওয়া ঘোড়া
মুসল্লা : দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী ঘোড়া
মুআফফা : তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ঘোড়া
এভাবে ধারাবাহিকভাবে তালি, মুরতাহ, আতিফ, বারিউ, মুআম্মিল, লাতীম, সুকাইম ইত্যাদি। সুকাইম বলা হয় যে ঘোড়াটা সর্বশেষ এসে পৌঁছেছে।

ঘোড়ার গায়ের রংয়ের ভিন্নতায়ও তার আলাদা আলাদা নাম আছে। একেবারে সাদা ঘোড়ার এক নাম, সাদাকালো মিশ্রিত ঘোড়ার আরেক নাম, পুরো শরীরে এক রং আর শুধু কপালে আরেক রং এমন ঘোড়ান অন্য নাম। যে ঘোড়ার সামনের পা এক রঙের আর পেছনের পা আরেক রঙের সেই ঘোড়ার আরেক নাম। এভাবে নামের কোন শেষ নেই।
দৌড়ানোর ধরনের দিকে লক্ষ্য করেও তার বহু নাম আছে। কুরআনে সূরা আদিয়াতে এর একটা নাম ব্যবহৃত হয়েছে। ক্ষুরের আঘাতে আঘাতে ঊর্ধ শ্বাসে ছুটে চলা ঘোড়াকে বলে আদিয়াত।

এই ধরনের ব্যাপকতা যে কেবল ঘোড়ার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ এমন কিন্তু নয়। দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে বাতাসের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বাতাসের গতি-প্রকৃতির তারতম্য অনুযায়ী এর বেশ অনেকগুলো নাম আছে। যেমন :
হাওজা : ডান দিক দিয়ে প্রবাহিত বাতাস
সবা : পুবালি বাতাস
নাসীম : মৃদুমন্দ বাতাস
আসিফ : ঝড়ো বাতাস
সরসর : ঠান্ডা বাতাস
সুমুম : গরম বাতাস
মুতানাওয়িহা : বিভিন্ন দিক খেকে আগত বাতাস
ই’সার : নিচ থেকে উপরের দিকে প্রবাহিত বাতাস
এছাড়াও বাতাসের আরও অনেক নাম আছে এর প্রকৃতি অনুযায়ী।

মোটকথা হলো, শব্দের ব্যাপকতার যে ভান্ডার আরবীভাষায় বিদ্যমান, সেটি পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন ভাষাতে পাওয়া অসম্ভব। ফলে মনের ভাব সংক্ষিপ্তাকারে প্রকাশ করাটা আরবীভাষায় খুবই সহজ। অনেক সময় দেখা যায় অন্য ভাষায় যে কথাটা লম্বা বাক্য রচনা করে বলতে হয় সে কথাটা আরবীতে মাত্র এক শব্দ দিয়ে ব্যক্ত করা যায়।

সমার্থক শব্দের ব্যাপকতার পাশাপাশি আরবীতে অর্থের ব্যাপকতা ও মর্মের গভীরতাও অতুলনীয়। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করছি।

স্বাগতমকে আরবিতে বলে আহলান সাহলান (أهلا سهلا)। এটা আমরা অনেকে জানি। বাংলাতেও এটি ব্যবহার করে অনেকে। যেমন বলে, আহলান সাহলান মাহে রমজান। তো সাধারণভাবে এর অনুবাদ যদিও স্বাগতম দিয়ে করা হয় কিন্তু আসলে শব্দটার অর্থ আরো অনেক বিস্তৃত ও গভীর মর্মযুক্ত।

আহলান সাহলান এর পূর্ণরূপ হলো আতাইতা আহলান ওয়াত্বীতা সাহলান (أتيت أهلا وطيت سهلا) এটাকেই সংক্ষেপে আহলান সাহলান বলে সবাই। তো এর পূর্ণরূপটার অর্থ হলো, আপনি নিজ পরিবারের কাছেই এসেছেন এবং সমতল ভূমি মাড়িয়েছেন।

এবার শুনুন কথাটার মানে। কেউ যখন বেড়াতে যায় তখন নতুন ও অপরিচিত জায়গা হবার দরুন সে খুব সংকোচবোধ করে। তো অতিথিকে আহলান বলে অভয় দেওয়া হয় যে, আপনি তো নিজ পরিবারের লোকদের কাছেই এসেছেন। আমরা আপনার আপনজন। সুতরাং সংকোচের কিছু নাই। আপনি পরিবারে যেমন নিঃসংকোচে থাকেন, এখানেও তেমন থাকুন।

মানুষ যখন উঁচুনিচু ভূমিতে হাঁটে তখন সে খুব পা টিপেটিপে ধীরেসুস্থে হাঁটে। ভয় ও আশংকার ভেতরে থাকে কখন না জানি হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়! একটা আতংকের মধ্যে তাকে থাকতে হয়। তো অতিথিকে বলা হলো, আপনি সমতল ভূমি মাড়িয়েছেন। আপনাকে অতো পা টিপেটিপে হাঁটতে হবে না। আপনি স্বাচ্ছন্দ্যে হাঁটুন। যেভাবে সমতল ভূমিতে মানুষ হাঁটে। আমরা উঁচুনিচু আর এ্যাবড়ো-থ্যাবড়ো জায়গার মতো না যে এখানে এতো আশংকা নিয়ে চলতে-ফিরতে হবে।

মোটকথা হলো, মেহমানকে অভয় দেওয়া ও আপন করে নেওয়া হলো কথাগুলোর উদ্দেশ্য। এবার বলুন তো, এতো বিস্তৃত অর্থ আর গভীর মর্ম কি বাংলার স্বাগতম, ইংরেজির ওয়েলকাম, ফার্সির খোশ আমদেদ কোনটাতে পাওয়া যায়? নাহ। অতিথিকে বরণ করে নেবার জন্য পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাতেও যেসব শব্দ বা বাক্য প্রচলিত কোনটাতেই এমন দারুন অর্থ নেই। এ কারণেই এই ভাষাকে আমি সবসময়ই অর্থ, মর্ম আর ভাবসম্প্রসারণের জন্য শ্রেষ্ঠ ভাষা বলতে কখনো দ্বিধা করি না।

এছাড়াও আরবীভাষার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো অন্য কোন ভাষাতে নেই। যেমন : ইরাব তথা শব্দের শেষ হরফের হারাকাতের ভিন্নতা। ইশতিক্বাক্ব তথা একটি শব্দমূল থেকে প্রচুর শব্দ উদ্গত হওয়া। মাখরাজ তথা প্রতিটি অক্ষর উচ্চারণের সূক্ষ্ম মাপজোখ ইত্যাদি। বলতে গেলে এমন আরও অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরা যাবে।

আমি আরবীভাষার একজন নগন্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষক। আরবীভাষার ভালোবাসা আমার হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত। আমি সবসময়ই অনুভব করি, ইসলামী শরীয়তের যে মেজায তার সাথে আরবীভাষা পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। এই ভাষা শরীয়তের চাহিদাকে যতোটুকু নিজের ভেতরে ধারন করতে পারে, অন্য কোন ভাষাতে সেই যোগ্যতা নাই। এই অনুধাবন আমি কোন বইপুস্তক থেকে পাইনি। আরবীভাষা পাঠদান করাতে গিয়ে সহসা একদিন বিষয়টি আমার মনের পর্দায় উদিত হয়। তারপর এটা নিয়ে যতোই ভাবতে থাকি, ততোই অভিভূত হই। বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করি, কিভাবে এই ভাষা পুরোপুরি পর্দা রক্ষা করে চলে। যা কিনা শরীয়তেরও কাম্য।

পৃথিবীতে যতো মানুষ আছে তারা যেমন হয়তো পুরুষ নয়তো মহিলা, তেমনি আরবীভাষায় যতো শব্দ আছে সেগুলোও হয়তো পুরুষ জাতীয় নয়তো স্ত্রী জাতীয়। নিয়ম হলো, স্ত্রী জাতীয় শব্দের সাথে সবসময়ই স্ত্রী জাতীয় শব্দই আনতে হয়। পুরুষ জাতীয় শব্দ আনা যায় না। এর বিপরীতে আবার পুরুষ জাতীয় শব্দের সাথে সবসময়ই পুরুষ জাতীয় শব্দ আনতে হয়। স্ত্রী জাতীয় শব্দ আনা যায় না। মানে, ফ্রি মিক্সিং অনুমোদিত নয় আরবিভাষাতে। আরবিভাষা সম্পর্কে যাদের সামান্য ধারণা আছে তারা এটি বুঝবেন।

তবে হ্যা, কোন কোন শব্দে দেখা যায় যে, তার সাথে পুরুষ জাতীয় ও স্ত্রী জাতীয় উভয় ধরনের শব্দই আসা অনুমোদিত। তার মানে, সেই শব্দগুলো মাহরাম পর্যায়ের। যার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ জায়েয।

আরো মজার ব্যাপার হলো, যেসব শব্দে এমন ভাষাগত পর্দা রক্ষা করতে হয় না সেগুলো সাধারণত ‘গায়র আক্বেল’ বা বোধবুদ্ধিহীন হয়ে থাকে। আরবিভাষাতে মানুষ-ফেরেশতা-জিন ছাড়া আর সকল প্রাণী ও বস্তুকেই ‘গায়র আক্বেল’ বা বোধবুদ্ধিহীন হিসেবে ধরা হয়। তো সাধারণভাবেও আমরা দেখি, ইসলামে মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণী ও জড় পদার্থের সাথে পর্দা করতে হয় না। এভাবে ইসলামের যে মেজায ও রুচি, তারসাথে আরবিভাষার প্রচুর মিল। হয়তো এসব কারণেই আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে এতো ভাষা থাকা সত্ত্বেও আরবিকেই তাঁর সম্মানিক কালাম কুরআনুল কারীমের ভাষা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।

#কোরআন_বোঝার_মজা_সিরিজ_৩

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × 2 =