বাঙলাভাষায় একটা সময়ে ধর্মীয় বইয়ের প্রচণ্ড সংকট ছিল। নানারকম সামাজিক সীমাবদ্ধতা আর সমস্যাকে ঘিরে এই সংকটটা জিইয়ে ছিল বহুদিন। কিন্তু মানুষের প্রয়োজন তো আর থেমে থাকে নি। দৈনন্দিন জীবনে ধর্মচর্চা করতে গিয়ে এবং নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞানকে পুষ্ট করতে স্বাভাবিকভাবেই তারা খুঁজতে থাকে ধর্মীয় বই। হাতের কাছে যা পেতো তাই কিনে নিয়ে আসতো। প্রতিদিন সেই বইয়ের চর্চা হতো। এসব বই আবার হাত ঘুরে এর ওর কাছে গিয়ে আরো বেশি পঠিত হতো। এমনই সংকটকালে রচিত হয়েছিল ‘মোকছুদুল মোমিনীন’ নামক বহুল প্রচলিত ও পঠিত গ্রন্থটি। বাজারে এই নামে বইটির অনেক সংস্করণ পাওয়া গেলেও আমাদের বাড়িতে যে কপিটা ছিল তার সংকলক হিসেবে মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুর রহমানের নাম লেখা। এবং সম্পাদনায় মাওলানা আবদুল কাদির খন্দকার।

বইটা বহুকাল ধরে আমাদের ঘরে পঠিত হয়ে আসছে। বইয়ের ভগ্নদেহ সেই সাক্ষ্য-ই প্রদান করে। আমি আগে থেকেই জানতাম এসব বই ভুলেভরা। অনির্ভরযোগ্য আর অপ্রমাণিত বিষয়ে ঠাসা। তবুও বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যই বইটা পড়া শুরু করলাম। দৃষ্টি ছিল পর্যালোচনার ও নিরীক্ষার।

লেখকের ভূমিকা পড়তে গিয়েই আমার আক্কেলগুড়ুম অবস্থা হল। তিনি বলছিলেন, “পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, সকল মুসলিম নর-নারীর জন্য ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ফরয।” অথচ মক্তবের একটা ছোট ছেলেও বলতে পারে যে এটা কুরআনের কোন আয়াত নয় বরং হাদিসের অংশ। তারমধ্যে আবার ‘নারী’ শব্দটা মুনকার। হাদীসে শুধু নরের উল্লেখ আছে। যদিও উভয় শ্রেণিই উদ্দেশ্য। এছাড়াও ভূমিকাতে তিনি অপ্রমাণিত একটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। সেটা হল, মাখলুকাতের সংখ্যা আঠার হাজার।

যেই লেখক হাদিসকে কুরআনের আয়াত বলে গুলিয়ে ফেলেন, তা-ও আবার লোকমুখে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ হাদিস, তার জ্ঞানের অবস্থা আন্দায করতে খুব বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করার আর প্রয়োজন পড়ে না। সুতরাং ভেতরে যে আরো এমন আজীব-গরীব জিনিসের দেখা পাবো সে আশা রেখেই আমি আগে বাড়তে থাকলাম।

‘মহান আল্লাহর পরিচয়’ শিরোনাম দিয়ে তিনি বইটি শুরু করেছেন। প্রথম পৃষ্ঠাতেই আবার চমকে যাবার ব্যবস্থা করে রেখেছেন তিনি। লিখেছেন, “আল্লাহ পাকের শান বলে শেষ করা যাবে না। পবিত্র কুরআনে তাঁর নিরানব্বইটি নাম রয়েছে।” এবারও তিনি হাদীসে উল্লেখিত বিষয়কে কুরআনে উল্লেখিত বলে দিলেন। আরেকবার তার জ্ঞানের দৌড় দেখতে পেলাম। তার বিষয়ে পূর্বে ব্যক্ত সিদ্ধান্তটা আমার আরো পোক্ত হল।

পরের পৃষ্ঠাতেই একটি আয়াত উল্লেখ করেছেন। যার আরবিপাঠটি বিশুদ্ধভাবে লেখা হয় নি। নিজেদের থেকে একটা শব্দ বাড়িয়ে দিয়েছেন।

২২ পৃষ্ঠাতে লেখক একটা জালকথা বলে দিলেন। সেটা হল, “আল্লাহ তাআলা সর্বপ্রথম তাঁর নূর থেকে নবী সা.কে সৃষ্টি করেছেন”। জালহাদিস বিষয়ক প্রায় সব গ্রন্থেই একে জাল বলা হয়েছে। দুই পৃষ্ঠা আগ বেড়ে তিনি আরো বলেছেন, মানুষের রুহ মৃত্যুর পর মাঝেমাঝে পৃথিবীতে বিচরণ করে এবং তাদের স্বজনদের কার্যকলাপ দেখে।

মুসলিম সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সর্বপ্রথম তাদের কানে আযান-ইকামত শোনানোর কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু লেখক ২৯পৃষ্ঠায় বলেছেন, “মুসলমানদের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করলে সর্বপ্রথম তার কানে কালেমা তাইয়েবার আওয়াজ শুনানো হয়।”

৩২ পৃষ্ঠায় লেখক বলেছেন, “হাদীস শরীফে ১ লক্ষ ২৪ হাজার বা ২ লক্ষ ২৪ হাজার নবী-রাসুলের উল্লেখ আছে।” অথচ বাস্তবতা হল, ২ লক্ষের কথা কোন বর্ণনাই পাওয়া যায় না। আর ১ লক্ষের বিষয়ে মুসনাদে আহমাদে একটি বর্ণনা পাওয়া গেলেও সেটি সনদগতভাবে দুর্বল। প্রকৃতপক্ষে নবি-রাসুলদের সঠিক সংখ্যা কেবল আল্লাহই জানেন।

৩৬ পৃষ্ঠায় তিনি একটি জালহাদিস উল্লেখ করেছেন। সেটি হল, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, জন্মভূমির উপর মোহাব্বত রাখা ঈমানের আলামত।” যদিও মূল আরবীতে আলামত না বলে একে অঙ্গ বলা হয়েছে। তবে এটি জাল হাওয়াটা সুপ্রসিদ্ধ। এর জন্য আলমাকাসিদুল হাসানাহ-২১৮, তাযকিরাতুল মওযুআত-১১ দেখা যেতে পারে।
এরকম আরো কিছু প্রসিদ্ধ-অপ্রসিদ্ধ হাদিস তিনি তার বইয়ে সন্নিবেশিত করেছেন। যার সবগুলো তুলে ধরলে লেখাটা অতিরিক্ত লম্বা হয়ে যেতে পারে।

বিশেষকরে ফজিলত বর্ণনায় লেখক এমনসব আজগুবি বিষয়ও উল্লেখ করেছেন যা মনগড়া হওয়ার বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তারপর তিনি মনগড়া কিছু নিয়ম-পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন সালাতের ক্ষেত্রে। বিশেষকরে শবেকদর আর শবে বরাতের জন্য আলাদ পদ্ধতির সালাতের কথা বলেছেন। যেমন প্রতি রাকাতে দশবার করে সুরা ইখলাস পড়া ইত্যাদি। এগুলো সবই বানোয়াট বিষয়। কদর বা বরাতের রাতের জন্য আলাদা ধরনের কোন সালাতের উল্লেখ হাদীসে পাওয়া যায় না। বরং সাধারণ নিয়মে নফল যেভাবে পড়তে হয় সেভাবেই পড়তে হবে।

এই বইটির সবচে বড় গোমরাহির অন্যতম হল ১৫২ পৃষ্ঠায় বর্ণিত একশত ত্রিশ ফরযের শিরোনামে চার মাযহাবকে চার ফরজ বলা। মাযহাব হল মূলত ইসলামী আইন শাস্ত্রের ধারা। যা সাধারণ মানুষদের জন্য ইবাদাত-বন্দেগির পথ ও পদ্ধতিকে সুগম করে। এটি প্রশংসনীয় হতে পারে। তাই বলে একে ফরজ বলে দেওয়া চরম গোমরাহি। মূলত এই বইটার কারণেই আমাদের সমাজে লোকমুখে এই কথাটা ছড়িয়েছে। যেটা কখনোই মাযহাবকে সমর্থনকারী আলেমরাও গ্রহণ করেন নি। উল্টো এর প্রতিবাদ করেছেন। কারণ ফরজ সাব্যস্ত হবার জন্য যেসব উপাদান থাকতে হয় তার কোনটাই এখানে নাই। তাছাড়া এই ভ্রান্ত কথাটার কারণে আমাদের দেশের এক শ্রেণির মানুষ, যারা ঢালাওভাবে মাযহাবের বিরুদ্ধাচরণ করে থাকেন, তারা একে হাতিয়ার বানিয়ে মাযহাবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে থাকেন। যা অত্যন্ত নিন্দনীয়। অথচ মাযহাবের নির্ভরযোগ্য কোন গ্রন্থেই মাযহাব মানাকে ফরজ বলা হয় নি।

একটা জায়গায় এসে হাসতে হাসতে আমার পেটব্যথা হবার যোগাড়। ‘পরশমনি দোআ’ নামে লেখক অনেকগুলো বানোয়াট-জাল দোআ বর্ণনা করেছেন বইয়ের শেষে। তো সেখানে একটা দোআ আছে সেটা নাকি জিবরাইল আ: রাসুলকে শিক্ষা দিয়েছেন। এই দোআর ফজিলত বলতে গিয়ে লেখক বলেন,
এক সাহাবি মাছ রান্না করতে গিয়ে দেখেন মাছ সিদ্ধ হচ্ছে না। তিনি রাসুল সা. কে সেটা জানালে তিনি আল্লাহর কাছে দোআ করলেন। তখন মাছ কথা বলতে শুরু করলো যে, জনৈক ব্যক্তি যখন নদীর তীরে বসে এই দোআ পড়ছিল তখন মাছ সেই দোআ মুখস্ত করে নেয়। ফলে সে আর সিদ্ধ হচ্ছে না। এরদ্বারা বুঝে আসে, এই দোআ পাঠ করলে দোযখের আগুন নিষ্কৃয় হয়ে যায়। দোআটি পড়তে গিয়েই হাসির কাণ্ড ঘটছিল। কারণ, দোআর মধ্যে শাহ মুহিউদ্দিন বিন অমুক বিন তমুক বলে লম্বা বংশধারা বর্ণনা করা হয়েছে। যার শেষ প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছে হুসাইন রা, হয়ে আলী রা, পর্যন্ত। স্পষ্টই বুঝে আসে এটা শিয়াদের তৈরি জাল বর্ণনা। কারণ, শাহ শব্দটা আরবি নয়। এটি ইরানের ভাষা ফার্সির শব্দ। আরবরা নামের শুরুতে শাহ ব্যবহার করে না। তাছাড়া যে বংশধারার উল্লেখ রয়েছে দোআটিতে রাসুলের যুগে তো তারা কেউ-ই ছিলেন না। মোটকথা এটা যে বানোয়াট সেটা বুঝার জন্য খুব বেশি জ্ঞানী হতে হয় না। চোখকান খোলা রেখে একটু খেয়াল করলেই হয়।

আমি এখানে অল্প কথায় এই বইটার উপর পর্যালোচনার চেষ্টা করেছি। বইটা যে আমাদের সমাজে কী পরিমাণ গোমরাহি ছড়িয়েছে তা এর থেকেই অনুমিত হয়। বাকি আরো বহু বিষয় তো বলাই হয় নি। তাহলে লেখাটি বেশি বড় হয়ে যাবে।

আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থের সংকটকালে এটি রচিত হওয়ায় খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে যায় এবং এতো বেশি প্রসিদ্ধি পায় যে, পরবর্তীতে অনেকেই এই একই নামে একটু এদিক সেদিক করে বই রচনা করে। ছোটো-বড়ো বিভিন্ন আকারে সেটা বিভিন্ন লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিতও। সবগুলোর ভেতরের অবস্থাই প্রায় কাছাকাছি। যেসব ধর্মীয় বই সবচে বেশি বিক্রি হয়েছে তার মধ্যে এটিও অন্যতম বলা যায়। এক কালে বইটি গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে প্রায় সবার ঘরে ঘরে পাওয়া যেতো। এখনও যে যায় না তা নয়। তবে তুলনামূলক কম। এবং বইটির বিশেষ পাঠক হলেন নারীশ্রেণি। তবে পুরুষরাও পড়ে থাকে।

বইটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল, দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সাধারণ সব মাসআলা-মাসায়েল, দুআ-দরুদ ও অন্যান্য বিষয় বইটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে। একটা বই কিনলেই প্রয়োজনীয় প্রায় সবই হাতের নাগালে চলে আসতে। তাছাড়া বাড়াবাড়ি ধরনের বানোয়াট অনেক ফজিলত ইত্যাদির উল্লেখ থাকায় তা ছিল সাধারণ মানুষের জন্য আরো বেশি র্আকর্ষণীয়।

বইটি নিয়ে রিভিউ লেখার কারণ হল, যাতে করে এই বইটির বিষয়ে জেনে সতর্ক হওয়া যায়। এবং অন্য যারা এটি পড়ে ইলম শিখতে সচেষ্ট তাদরকেও সতর্ক করা। কারণ ইলম দ্বীনেরই অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এটি শেখার আগে তার সোর্সটা নির্ভরযোগ্য হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

প্রশ্ন হল, এই বই না পড়লে পড়বেটা কি? তো সেজন্য আমার কাছে এর উত্তম বিকল্প মনে হয় মাওলানা হেমায়েত উদ্দীনের লেখা ‘আহকামে যিন্দেগী’ বইটি। এটিও দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব হুকুম-আহকাম সম্বলিত। একটা বই থাকলেই মোটামুটি যথেষ্ট হয়ে যায় প্রাথমিকভাবে।

শেষকথা হল, বইটি যদি কেউ ভ্রান্তিগুলো জানার জন্য পড়তে চায় তাহলে তো ঠিকই আছে। তবে তার আগে ভ্রান্তিগুলো বোঝার মতো যোগ্যতা আছে কিনা সেটা বিবেচ্য বিষয়। আর যদি কেউ দ্বীন শেখার জন্য এটি পড়তে চায় তবে তা মোটেই উচিত হবে না। কারণগুলো আগেই ব্যখ্যা করা হয়েছে।

[ লিখেছেন: আবদুল্লাহ আল মাসউদ ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *